পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়

by
Mar 26, 2015
134 Views
Comments Off on পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়
0 0

আমরা প্রায় সবাই মরক্কোর University of Karueein -কে পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জানি। এমনকি “গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসও” এটিকে পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নালন্দাই পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়।

৫০০ সালের দিকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের বর্তমান পাটনাতে প্রতিষ্ঠা পায় বলে প্রাচীন ইতিহাসে পাওয়া যায়। প্রাচীন নালন্দা একসময় অন্যতম অবিতর্কিত শিক্ষাকেন্দ্র ছিলো। নালন্দা প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৮০০ বছর পর্যন্ত তার শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিয়েছিলো। ২,০০০ শিক্ষকের ও ১০,০০০ শিক্ষার্থীর এটি একটি সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো।

নালন্দাতে ৬৮টি বিষয় পড়ানো হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার নূন্যতম বয়স ছিল ১৬। সেসময় নালন্দাতে বিভিন্ন দেশ থেকে পড়াশোনা করতে আসতেন। নালন্দার বিখ্যাত ও অভিজ্ঞ শিক্ষকরাই ছিলেন বিভিন্ন দেশ থেকে মেধাবী শিক্ষার্থী টেনে আনার মূল হাতিয়ার। চীন, কোরিয়া, জাপান, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কা, ব্যবিলন, গ্রীস, সিরিয়াসহ আরো অনেক দেশ। অভিজ্ঞ শিক্ষকেরা বেদ, ভাষা, ব্যাকরণ, দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা, শল্যচিকিৎসা, ধনুর্বিদ্যা, রাজ্যশাসনবিদ্যা, সমরবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, হিসাববিজ্ঞান, বাণিজ্য, সঙ্গীত, নৃত্য ও অন্যান্য কলাবিদ্যা, বিজ্ঞান, জটিল গাণিতিক সমাধান। নালন্দাতে বিখ্যাত শিক্ষকের মধ্যে জীবক, পাণিনি, কুটিলা, বিষ্ণু শর্মা-রা ছিলেন অন্যতম। অর্থাৎ একটি পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচীন ভারতেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলো।

প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ

কথিত আছে, গৌতম বুদ্ধ একাধিকবার নালন্দায় অবস্থান করেছিলেন। বুদ্ধের সমসাময়িক কালেই নালন্দা সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী নগরী ছিলো। সেই যুগে এই শহর ছিল ঘন জনাকীর্ণ। তবে শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে এর খ্যাতি পরবর্তীকালে বিপুলপরিমাণে অর্জিত হয়। কথিত আছে, ২৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সম্রাট অশোক সারিপুত্তের স্মৃতিতে এখানে একটি স্তুপ নির্মাণ করেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিলো গুপ্ত সম্রাট কুমারগুপ্তের রাজত্বকালে। হিউয়েন সাঙ ও প্রজ্ঞাবর্মণ তাঁকে এই মহাবিহারের প্রতিষ্ঠাতা বলে উল্লেখ করেছেন। মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত একটি সিলমোহর থেকেও একথা জানা যায়। ঐতিহাসিক সুকুমার দত্তের মতে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে মূলত দুটি পর্ব বিদ্যমান ছিল। প্রথমত এই বিশ্ববিদ্যালের প্রতিষ্ঠা, বিকাশলাভ ও খ্যাতি অর্জনের পর্ব। এই পর্বের সময়কাল খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে নবম শতাব্দী। এই সময়টি ছিল গুপ্ত যুগের ঐতিহ্য অনুসারে প্রাপ্ত মুক্ত সাংস্কৃতিক চিন্তা ও ঐতিহ্যের পর্ব। এর পর নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে পূর্বভারতের বৌদ্ধধর্মে তান্ত্রিক রীতিনীতির আবির্ভাব ঘটলে এই মহাবিহারও ধীরে ধীরে পতনের পথে ধাবিত হয়।

একটি প্রধান ফটক এবং সুউচ্চ দেয়ালঘেরা বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপত্যের একটি মাস্টারপিস হিসেবে সুপরিচিত ছিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি ভিন্ন ভিন্ন চত্বর এবং দশটি মন্দির ছিলো, ছিলো ধ্যান করার কক্ষ এবং শ্রেনীকক্ষ। প্রাঙ্গনে ছিল কতগুলো দীঘি ও উদ্যান।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার “ধর্ম গুঞ্জ বা ধর্মগঞ্জ”  সেই সময়ে বৌদ্ধজ্ঞানের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ভান্ডার হিসাবে সুপরিচিত ছিলো। পাঠাগারে ছিল শত শত হাজার হাজার পুঁথি, এবং এর পরিমাণ এতই বেশী ছিল যে এগুলো পুড়তে কয়েক মাস সময় লেগেছিল যখন মুসলিম আক্রমনকারীরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলো। পাঠাগারের মূল ভবন ছিলো তিনটি যার প্রত্যেকটি প্রায় নয়তলা ভবনের সমান উঁচু। ভবনগুলো-“রত্নসাগর”, “রত্নদধি” ও “রত্নরঞ্জক” নামে পরিচিত ছিলো।

নতুন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম

১১৯৩ সালে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী নালন্দা মহাবিহার ধ্বংস করে ফেলেন, এই ঘটনাটি ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়। পারস্যের ইতিহাসবিদ মিনহাজ তার “তাবাকাতে নাসিরি” গ্রন্থতে লিখেছেন যে হাজার হাজার বৌদ্ধ পুরোহিতকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় কিংবা মাথা কেটে ফেলা হয়, খিলজি এভাবে এই অঞ্চল থেকে বৌদ্ধধর্ম উৎপাটন করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।

৮০০ বছর পর সেই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আবার জেগে উঠেছে। ২০১৪ সালে রাজগিরে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শিক্ষক দ্বারা শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

Article Categories:
শিক্ষাঙ্গন