সপ্তাশ্চার্য – পর্ব ৫ঃ কলোসিয়াম

by
Oct 9, 2015
91 Views
Comments Off on সপ্তাশ্চার্য – পর্ব ৫ঃ কলোসিয়াম
0 0

ধারাবাহিক সপ্তাশ্চার্যে আপনাদের স্বাগতম। গত পর্বে আপনারা ভারতের “তাজমহল” নিয়ে ধারণা পেয়েছেন কিছুটা। আজকের ৫ম পর্বে আপনাদের জন্যে রয়েছে ইটালির “কলোসিয়াম”।

প্রত্নতত্ত্বের শহর রোম, শান্তির শহর রোম। কলোসিয়ামের কারণে রোম নগরীকে রক্তের আর হত্যার শহর বলেও ডাকা হতো এক সময়। বিশ্বের অনেকেই হয়তো জানেন না, লাখো রাজবন্দি, যুদ্ধবন্দি, ক্রীতদাস আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অসহায়দের রক্তে সিক্ত কলোসিয়ামের মাটি, প্রতিটি ধূলিকণা। অদ্ভূত কাঠামোর ইমারতটির প্রতিটি ইট,কাঠ,পাথরে মিশে আছে নিহতদের অন্তিম নিঃশ্বাস। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা সেই বিভৎস, জঘণ্যতম প্রাণ সংহারী দ্বৈত-যুদ্ধের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে বিশেষ নির্মাণশৈলীর এ কলোসিয়াম।

ইতালির রাজধানী রোম নগরীতে ছাদবিহীন মঞ্চকেই বলা হয় কলোসিয়াম। চারতলা বিশিষ্ট অনেকটা বৃত্তাকার এই মঞ্চটি নির্মাণশৈলীর কারণে এখনো বিস্ময়াভিভূত করে মানুষকে। কলোসিয়াম একটি উপবৃত্তাকার কাঠামো, যা ১৮৯ মিটার দীর্ঘ এবং ১৫৬ মিটার চওড়া। এটির মূল এলাকা ছয় একর। বাইরের দেয়ালের উচ্চতা হল ৪৮ মিটার এবং ঘের মূলত ৫৪৫ মিটার। কেন্দ্রীয় রণভূমি একটি উপবৃত্তাকার এলাকার ৮৭ মিটার। ৫৫ মিটার চওড়া এবং একটি পাঁচ মিটার উচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, যা আসন বিন্যাসের টায়ারগুল দ্বারা বেষ্টিত।

৭০-৭২ খ্রিস্টাব্দে এটির নির্মাণ কাজে হাত দেন ফেরিয়াস বংশের সম্রাট ভেসপাজিয়ান। মূলত জনসভা ও নাট্য উৎসবের জন্য ইমারতটি তৈরি করিয়েছিলেন তিনি। নাম রেখেছিলেন এমফি-থিয়েটারিয়াম ফেভিয়াম। সাত বছরে তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণের সময় তার আকস্মিক মৃত্যু হয়। এরপর ক্ষমতায় বসেন তারই পুত্র টাইটাস।যিনি ছিলেন পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম সম্রাটের একজন। ৮০ খ্রিস্টাব্দে এমফি-থিয়েটারের বাকি কাজ সম্পন্ন হয় তারই হাত ধরে। পাশাপাশি ভবনটি নতুন করে নকশাও করেন তিনি। পরিবর্তিত নকশায় হাইপোজিয়াম নামে মাটির নিচে নির্মাণ করা হয় বেশ কিছু ট্যানেল। এখানে যুদ্ধের মাধ্যমে বলি দেওয়ার জন্য রাখা হতো হাজারো পশু, দাস ও দন্ডপ্রাপ্তদের। তবে বাবার দেওয়া নাম পাল্টে “কলোসিয়াম” রাখেন টাইটাস। কলোসিয়ামের জনসভাস্থলটিকে “বিশেষ খেলার স্থান” হিসেবে ঘোষণা করেন তিনি। ভূমিকম্পের কারণে ভবনটির বেশকিছু অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেকবার। বেশ কিছুবার এটি মেরামতও করা হয়।

কলোসিয়াম

১৬ ও ১৭ শতাব্দীতে কলোসিয়ামের দায়িত্ব পুরোটাই চলে যায় চার্চের দখলে। পোপ সিক্সটাস-৫ (১৫৮৫-৯০) কর্মহীনদের কাজের ব্যবস্থা করতে কলোসিয়ামকে উলের কারখানা বানানোর পরিকল্পনা করেন। ১৬৭১ সালে কার্ডিনালদের তত্ত্বাবধানে ষাড়ের লড়াই হতো এখানে। ১৭৪৯ সালে চতুর্দশতম পোপ বেনেডিক্স নিহত শহীদের আত্মার শান্তি কামনায় এটাকে “শান্তি মন্দির” ঘোষণা করেন। সেই সময় থেকেই সেখানে নিষিদ্ধ করা হয় প্রাণ বলি দেওয়ার নিষ্ঠুর খেলা।

রক্ত-পিপাসু রোম সম্রাটদের বিকৃত আনন্দের খোরাক যোগাতে গিয়ে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এই বধ্যভূমিতে, ইতিহাস তার সঠিক হিসাব রাখেনি। শুধু মানুষই নয়, কলোসিয়ামের মাটিতে অজস্র্র বন্য জীবজন্তুর রক্তও মিশে আছে। সম্রাটদের নির্দেশে রাজকোষের অর্থে সেই সময় এক বিশেষ খেলার জন্য উত্তর আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমদানি করা হতো হাজারে হাজারে হাতি, গন্ডার এবং সিংহ। ভাল্লুকের সঙ্গে হাতি, হাতির সঙ্গে বুনো মহিষ বা গন্ডারের সঙ্গে হাতির লড়াই দেখত হাজারো বিশ্ব সম্ভ্রান্তরা। পশুদের মৃত্যুবেদনার হুংকারের সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ত পুরো গ্যালারি। কলোসিয়ামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৯ হাজারেরও বেশি পশুর প্রাণ গিয়েছিল। তবে দীর্ঘদিন পশুর লড়াই আর এগুলোর করুণ মৃত্যু দেখতে দেখতে একঘেয়েমি বোধ করেন সম্রাট টাইটাস। পশুর স্থলে মানুষে-মানুষে লড়াইয়ের ধারণা এলো তার মনে। আর পশুর খেলা বন্ধ করে, শুরু করা হলো মানুষের রক্তের হলি খেলা। শুরু হলো মানুষের মৃত্যুর করুণ ও বীভৎস কাহিনী। যুদ্ধবন্দিদের মরণপণ লড়াই যতক্ষণ না দুইজনের একজনের মৃত্যু হতো, ততক্ষণ পর্যন্ত চলত সেই দ্বৈত-লড়াই। কিন্তু মাত্র একশটি খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল টাইটাসের। এরপর হঠাৎ করেই একদিন বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যান তিনি। বন্ধ হয়ে যায় এই খেলা। লম্বা বিরতির পর ৬৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রুটাস ভ্রাতৃদ্বয় ফের চালু করেন ঐতিহ্যবাহী ওই খেলা। তারা “গ্ল্যাডিয়াস” (খাটো তরবারির) লড়াই চালু করেন। লড়াইকারীদের বলা হতো “গ্ল্যাডিয়েট”। লড়াই চলাকালে কোনো এক “গ্ল্যাডিয়েটর” আহত হয়ে পড়ে গেলে উল্লাসে ফেটে পড়ত পুরো কলোসিয়াম। মৃত্যু ভয়ে ভীত, ক্ষত-বিক্ষত “গ্ল্যাডিয়েটর” রেওয়াজ অনুযায়ী বা হাত তুলে সম্রাটের করুণা প্রার্থনা করত, প্রাণভিক্ষা চাইত। মঞ্জুর করা না করা সম্পূর্ণ তার মন-মেজাজের ওপর নির্ভর করত। সম্রাটের বাম হাতের বুড়ো আঙুল আকাশ নির্দেশ করলে অপর “গ্ল্যাডিয়েটর” বুঝে নিত যে তাকে ছেড়ে দাও। কিন্তু ভূমি নির্দেশ করার অর্থ, শেষ করে দাও।

রোমের দুর্ধর্ষ শাসক জুলিয়াস সিজার এখানে বসেই ৩০০ গ্ল্যাডিয়েটরের লড়াই উপভোগ করেন। আর সম্রাট ট্রাজান উপভোগ করেন পাঁচ হাজার দ্বৈত-যুদ্ধ। খিস্টানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হতো এ কলোসিয়ামে। সেখানে ভ্যাটিকানের সর্বোচ্চ খ্রিস্টান ধর্মগুরুরা উপস্থিত থাকেন। অংশ নিতেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরাও। সেখানে এক ধর্মীয় উৎসবে উপস্থিত প্রত্যেককে কলোসিয়ামের এক মুঠো করে মাটি উপহার দিতে চেয়েছিলেন পোপ গ্রেগরি। কিন্তু কেউই তা নিতে রাজি হননি। তাদের অভিযোগ, এই মাটি হাতে নিয়ে চাপ দিলে এখনো বের হবে তাজা রক্ত, রয়েছে রক্তের গন্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যত রক্ত ঝরেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি রক্ত ঝরেছে রোমের কলোসিয়ামের এই মাটিতে।

সে যাই হোক বর্তমান সময়ে এটি রোমের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ভ্রমণপিপাসুরা প্রতি বছরই এটি দেখার জন্যে রোম গমন করেন। বছরে ৩.৯ মিলিয়ন ভ্রমণপিপাসু মানুষ সেখানে যান। বর্তমানে সেখানে একটি যাদুঘর রয়েছে। ঘুরে আসুন কলোসিয়াম আর অনুভব করে আসুন সেই সময়ের দিনগুলি।

 

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া, History.com

পরবর্তী সপ্তাশ্চার্য ৬ষ্ট পর্বঃ মাচু পিচু

Article Categories:
বিদেশ