সপ্তাশ্চার্য – পর্ব ৬ঃ মাচু পিচু

by
Oct 15, 2015
55 Views
Comments Off on সপ্তাশ্চার্য – পর্ব ৬ঃ মাচু পিচু
0 0

ধারাবাহিক সপ্তাশ্চার্যে আপানদের সুস্বাগতম। সপ্তাশ্চার্যের পর্বগুলি প্রায় শেষের পথে! এর আগের পর্বে আপনারা “কলোসিয়াম” এর সবন্ধে জেনে নিয়েছেন। আজ ৬ষ্ঠ পর্বে আপনাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে পেরুর “মাচু পিচু”।

“মাচু পিচু” অতীতে ইনকার একটি শহর হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলো, যার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ট হতে ২৪০০ মিটার বা ৭৮৭৫ ফুট। পেরুর উরুবাম্বা উপত্যকার উপরে একটি পর্বতচূড়ায় এটির অবস্থান। ধারণা করা হয় খুব সম্ভবত মাচু পিচুই ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন, যাকে প্রায়ই ইনকাদের হারানো শহর বলা হয়। এটি দক্ষিণ আমেরিকার একটি অন্যতম প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র এবং পেরুর সবচাইতে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান।

১৪৫০ সালের সময় মাচু পিচু নির্মিত হয় যখন ছিলো ইনকা সভ্যতার স্বর্ণযুগ। কিন্তু ১০০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটিকে পরিত্যাক্ত করা হয়। ধারণা করা হয় যে, স্পেনীয় অভিযাত্রীদের আগমনের আগেই এই শহরের সকল অধিবাসীরা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। মাচু পিচুর সন্ধানকারী হাইরাম বিঙাম এবং আরও অনেকেরই মতে এই সুরক্ষিত শহরটি ইনকাদের ঐতিহ্যগত জন্মস্থান অথবা সূর্য কুমারীদের পবিত্র কেন্দ্র ছিলো।

অন্য একটি মতবাদ অনুসারে মাচু পিচু একটি ইনকা লিয়াক্তা বা এমন একটি উপনিবেশ যা বিজিত অঞ্চল সমূহের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রনে ব্যবহৃত হতো। আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি একটি জেলখানা হিসাবে ভয়ংকর অপরাধীদের রাখার জন্য নির্মিত হয়েছিল। অন্যদিকে জন রো ও রিচার্ড বার্গার সহ আরও অনেকের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মাচু পিচু কোনও প্রতিরক্ষামূলক আশ্রয়স্থল নয়, বরং এটি ইনকা সম্রাট পাচাকুতিকের একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র। বেশির ভাগ পুরাতত্ত্ববিদই এই মতবাদকে সমর্থন করেছেন। এছাড়াও ইয়োহান রাইনহার্ড এর উপস্থাপিত তথ্য এটা প্রমাণ করেন যে, এই স্থানটিকে শহর নির্মাণের জন্য বেছে নেয়া হয়েছিল এর পবিত্র ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, অনেকেই ধারণা করেন এর পাহাড় চূড়াগুলোর অবস্থান প্রধান প্রধান জ্যোতির্মণ্ডলীয় ঘটনাবলীর সাথে সামঞ্জস্যতাপূর্ণ।

মাচু পিচু

এই দুর্গনগরীটি ইনকাদের রাজধানী কোস্কো থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) দূরে অবস্থিত। কিন্তু এর অবস্থান অজ্ঞাত থাকার কারণে অন্যান্য ইনকা নগরীর মত এই শহরটি কখনও স্পেনীয়দের দ্বারা আক্রান্ত এবং লুট হয়নি। কয়েক শ’বছর জনমানবহীন থাকার ফলে শহরটি এক সময় ঘন জঙ্গলে ঢেকে যায় এবং তখন খুব কম লোকই এর অস্তিত্ব সম্বেন্ধে জানতো। পরবর্তীকালে ১৯১১ সালের ২৪শে জুলাই মার্কিন ঐতিহাসিক ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রভাষক হাইরাম বিঙাম শহরটিকে বিশ্বের নজরে নিয়ে আসেন। আগেই মাচু পিচুতে গিয়েছিলেন এমন কিছু স্থানীয় মানুষ তাঁকে সেখানে নিয়ে যান। সেখানে বিঙাম শহরটির পুরাতাত্ত্বিক নিরীক্ষা ও জরিপ করেন। তিনিই মাচু পিচুর নাম দেন ইনকাদের হারানো শহর এবং তাঁর প্রথম বইটিও এই শিরোনামে প্রকাশিত হয়। তিনি কখনওই স্থানীয় সেসব লোকদের কোনও উল্লেখ করেন নি যারা তাঁকে মাচু পিচুতে নিয়ে গিয়েছিলেন; এমনকি মাচু পিচুর উদ্ঘাটনে তাঁদের কোনও কৃতিত্বও স্বীকার করেননি। তিনি তাঁর গাইড হিসাবে শুধু স্থানীয় উপকথার উল্লেখ করেছেন।

বিঙাম অনেকটা ঘটনা চক্রেই মাচু পিচুর উদ্ঘাটন করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ইনকা শহর বিতকোসের সন্ধান করছিলেন, এটি পেরুতে স্পেনীয়দের আক্রমণের বিরুদ্ধে সর্বশেষ ইনকা প্রতিরোধের স্থান এবং ইনকাদের শেষ আশ্রয়স্থল ছিল। বেশ কয়েক বছরের ভ্রমণ ও অনুসন্ধানের পর ১৯১১ সালে কেচুয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিঙামকে মাচু পিচু শহরে নিয়ে যায়। এই সম্প্রদায় মাচু পিচুতে ইনকাদের নির্মিত স্থাপনাগুলোয় থাকতো। সে সময় মাচু পিচুতে কিছু মমি পাওয়া যায়। বিঙাম সেখানে বেশ কয়েকবার ভ্রমণ করেন এবং ১৯১৫ সাল পর্যন্ত সেখানে খনন কাজ পরিচালনা করেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় মাচু পিচুর আবিষ্কার নিয়ে বেশ কিছু বইও লিখেছেন।

সিমোন ওয়েসবার নামের একজন কোস্কো শহর গবেষিকা দাবী করেছেন যে এনরিকে পালমা, গাবিনো সাঞ্চেস এবং আগুস্তিন লিসারাগা-এই ব্যক্তিত্রয় ১৯০১ সালে ১৪ই জুলাই মাচু পিচুর একটি পাথরে তাঁদের নাম খোদাই করেন। এর অর্থ এই তিন ব্যক্তি হাইরাম বিঙামের অনেক আগেই শহরটির খুঁজে পান। একই ভাবে কেউ কেউ দাবী করেন যে ফ্র্যাংকলিন নামের একজন প্রকৌশলী দূরবর্তী এক পাহাড় থেকে মাচু পিচুর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। তিনি ওই এলাকায় বসবাসরত টমাস পেন নামক একজন ইংরেজ প্লিমথ ব্রেদ্রেন খ্রিস্টান মিশনারিকে এই শহরটির কথা বলেন। পেন পরিবারের দাবী, তিনি ও স্টুয়ার্ট ই ম্যাকনের্ন নামক তাঁর একজন সঙ্গী মিশনারি ১৯০৬ সালেই মাচু পিচুতে যান।

১৯১৩ সালে জাতীয় ভৌগোলিক সংস্থা তথা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি তাদের এপ্রিল মাসের পুরো সংখ্যাটি মাচু পিচুর ওপর প্রকাশ করলে শহরটি ব্যাপক প্রচারণা পায়। মাচু পিচুর আশপাশের ৩২৫.৯২ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে ১৯৮১ সালে পেরুর “সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা” হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

মাচু পিচু

মাচু পিচুর এক পাশ চূড়া থেকে একেবারে খাড়া ভাবে ৬০০ মিটার নিচে উরুবাম্বা নদীর পাদদেশে গিয়ে মিশেছে। গিরিখাত ও পাহাড়পর্বতের দ্বারা প্রাপ্ত চমৎকার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে এই শহরের অবস্থান সামরিক কৌশলগত দিক থেকে গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। উরুবাম্বা নদীর ওপর দড়ির তৈরি সেতু ইনকা সৈন্যদের গোপন প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হত। মাচু পিচুর পশ্চিম দিকে গাছের গুড়ি নির্মিত আরেকটি সেতু ছিলো। এই সেতুর মাঝে ৬ মিটার (২০ ফুট) জায়গা ফাঁকা ছিলো, প্রয়োজনমত গাছের তক্তা দিয়ে সেতুর দুই অংশকে সংযুক্ত করা যেতো। সেতুটির নিচে ৫৭০ মিটার (১৯০০ ফুট) গভীর গিরিখাত, তাই গাছের তক্তা সরিয়ে দিলে কোনও শত্রুর পক্ষে তা অতিক্রম করা দুঃসাধ্য ব্যাপার হতো। এই সেতুটি নির্মিত হয়েছিল উরুবাম্বা উপত্যকার উপরে।

শহরটি দুই পাহাড়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এখান থেকে নিচের উপত্যকা পরিস্কারভাবে দৃশ্যমান, যা সামরিক দিক দিয়ে এক সুবিধাজনক অবস্থান ছিলো। এছাড়া শহরের পেছনের খাড়া পর্বত প্রায় অনতিক্রম্য। মাচু পিচুর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পাহাড়ি ঝর্ণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যা সহজে বন্ধ করা যেতো না। এছাড়াও যে পরিমাণ চাষযোগ্য জমি ছিলো তাতে উৎপন্ন ফসলে শহরের মোট জনসংখ্যার চারগুণ মানুষের খাদ্যের সংস্থান সম্ভব ছিলো। পর্বতের পাশগুলো ধাপকেটে সমান করা হয়েছিল। এতে একদিকে যেমন চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, অন্যদিকে খাড়া ঢাল বেয়ে শহরে আসার পথটি আক্রমণকারীদের জন্য দুর্গম করা হয়েছিল। মাচু পিচু থেকে পাহাড়ের ওপর দিয়ে কোস্কো যাবার দুটি পথ আছে, একটি “সূর্য দরজা” দিয়ে এবং অন্যটি “ইনকা সেতু” দিয়ে। শত্রুর আক্রমণের মুখে দুটি পথই সহজে বন্ধ করে দেয়া যেতো। এই শহরের মূল উদ্দেশ্য যাই হোক না কেনো, এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিলো খুবই মজবুত।

মাচু পিচুকে ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো “ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট” হিসেবে ঘোষণা করে। এ ঘোষণায় মাচু পিচুকে বর্ণনা করা হয়েছে ধ্রুপদী বাস্তুকলার নিদর্শন ও ইনকা সভ্যতার অনন্য স্বাক্ষর হিসেবে। পেরুর সবচাইতে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান ও অন্যতম আয়ের উৎস হবার ফলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে পেরু সরকার এখানে যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধার জন্য একটি কেবল কার নির্মাণ এবং বুটিক, পর্যটকদের কমপ্লেক্স ও রেস্তোরাঁ সংবলিত একটি বিলাসবহুল হোটেল তৈরির অনুমতি দেয়। বিজ্ঞানী, শিক্ষাবীদ ও পেরুর জনগণ এই পরিকল্পনার তীব্র প্রতিবাদ করে, তাদের সংশয় ছিল এর ফলে মাচু পিচুতে পর্যটকের সমাগম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধিপাবে এবং তা এই পুরাকীর্তির অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করবে।

তা সত্ত্বেও প্রতি বছরই মাচু পিচুতে পর্যটক সমাগম বাড়ছে, যা ২০০৩ সালে ৪ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। ফলে মাচু পিচুতে আর কোনো ধরণের সেতু নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত আছে এবং বর্তমানে মাচু পিচুর উপর দিকে যেকোনো ধরণের উড়োজাহাজ চালানো নিষিদ্ধ।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া।

পরবর্তী সপ্তাশ্চার্য ৭ম এবং শেষ পর্বঃ চিচেন ইৎজা

Article Categories:
বিদেশ