সত্যিকার জলদস্যুদের নিয়ে অবাক করা তথ্য!

by
Apr 23, 2017
64 Views
Comments Off on সত্যিকার জলদস্যুদের নিয়ে অবাক করা তথ্য!
0 0

জলদস্যুদের নিয়ে যত গল্প, কাহিনী তার বেশিরভাগ মূলত ১৭, ১৮ শতকের দিকের ক্যারিবিয়ান জলদস্যুদের। বিভিন্ন চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে তাদের নিয়ে। হলিউডে নির্মিত ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’ চলচ্চিত্রের খ্যাতি তো বিশ্বব্যাপী। চলুন জেনে নেওয়া যাক জলদস্যুদের নিয়ে কয়েকটি অবাক করা তথ্য।

১। বর্তমানেও জলদস্যুদের অস্তিত্ব রয়েছে! পাইরেটদের সোনালী দিনের গল্প শোনে বর্তমানের মানুষ অবাক হয়, ট্রেজার আইল্যান্ড পড়ে তারা তৎকালীন পাইরেটদের প্রেমেও পড়ে। কিন্তু পাইরেট শুধুমাত্র ১৭ কিংবা ১৮ শতকের দিকেই ছিল না। পাইরেট ছিল তারও পূর্বে থেকে। গালফ অব এডেন, মাদাগাস্কার, স্ট্রেইট অব মালাস্কা সবসময়ই পাইরেটদের স্বর্গরাজ্য ছিলো। বর্তমান পৃথিবীতেও পাইরেটদের অস্তিত্ব রয়েছে। ২০০০ সালের দিকে পাইরেটদের অস্ত্র হাতে ছোট-বড় বহর নিয়ে বানিজ্যিক জাহাজ আক্রমন করতে দেখা যায়।

২। আমাদের জানা সব জলদস্যুরাই অপরাধী নয়! সব পাইরেট নিজেদের তৈরী নিয়ম মেনে চলতো। নিজেদের কর্মকান্ডের জন্য শুধুমাত্র ক্যাপ্টেন ব্যতীত অন্য কাউকেই জবাবদিহি করতে হতো না। আবার এক ধরনের পাইরেট ছিল, যারা সরকারের আদেশ মেনে চলত। এদেরকে ‘প্রাইভেটির’ বলা হতো। তাদের কাজ ছিল সরকারী যেকোনো মিশন পূর্ন করা। অটোম্যান সাম্রাজ্যের ভাড়া করা ‘বারবারি কোরসেয়ার্স’ একজন বিখ্যাত প্রাইভেটির। ডানকার্করাও প্রাইভেটির হিসেবে দারুণ ছিল, তারা স্প্যানিশ রাজতন্ত্র রক্ষা করতে অবদান রেখেছিল। ১৬১৬ সাল থেকে ১৬২৪ সাল পর্যন্ত ডানকার্ক প্রাইভেটিররা প্রায় ১৪৯৯টি জাহাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নেয় এবং প্রায় ৩৩৬টি জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়।

৩। একসময় সারা পৃথিবীজুড়ে পাইরেটদের রাজত্ব ছিল! আমাদের ধারণা পাইরেটদের রাজত্ব শুধুমাত্র ক্যারিবিয়ানকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু তারা সারা পৃথিবীজুড়ে রাজত্ব কায়েম করেছিল। প্রায় প্রতিটি সাগরের আলাদা-আলাদা পাইরেটদের নানা কাহিনী রয়েছে। কুখ্যাত ‘বারবারাসা ব্রাদার্স’ মেডেস্টেরিয়ান সমুদ্রে ইউরোপের জাহাজগুলো আক্রমন করে প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হয়েছিল। উত্তর আফ্রিকার বারবারি কোস্টে তাদের রাজত্ব ছিল, অবশেষে শুধু তাদের ধ্বংস করতেই পোপ একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করে। ১৫৫৭ সালে ইংল্যান্ডের রানী ব্যক্তিগতভাবে ‘স্যার ফ্রান্সিস ড্রেইক’ নামক নাবিককে ভাড়া করে স্প্যানিশ পাইরেটদের ধ্বংস করতে। চীনদেশের কুখ্যাত পাইরেটদের মধ্যে অন্যতম ছিল মাদাম চেং। মাদাম চেং-এর স্বামীর পাইরেসির বিশাল ইতিহাস রয়েছে। কথিত আছে, মাদাম চেং ১৮০০-এর বেশি জাহাজ এবং ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের এক বাহিনী তৈরী করেছিল।

৪। প্রচলিত আছে পাইরেটরা তাদের ধন-সম্পত্তি লুকিয়ে রাখত, এটা অনেকটা বিশ্বাসযোগ্য কারন সবাই ছিল ঘোরতর অপরাধী, ধরা পড়ার ভয়ে এবং ধনসম্পত্তি হারানোর ভয়ে তারা তা লুকিয়ে রাখতে পারতো। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে কোন পাইরেট ধনসম্পত্তি লুকিয়ে রাখেনি। শুধুমাত্র উইলিয়াম কিড একবার ধনসম্পত্তি লুকিয়ে রেখেছিল। সে চেয়েছিল সে ধরা পড়ার পর তার লুকিয়ে রাখা ধনসম্পত্তি বিনিময়ে জীবন বাঁচাবে। কিন্তু এটা কোন কাজে আসেনি। তাঁকে পাইরেট হিসেবেই ফাঁসিতে ঝুলানো হয়।

৫। কথিত আছে ‘ওয়াকিং দ্য প্ল্যাঙ্ক’ ছিল পাইরেটদের দেয়া প্রচলিত শাস্তি। কিন্তু এটা সম্পূর্ণভাবে সত্য নয়। যখন কোন ঘোরতর অপরাধীকে সাজা দেওয়া হতো, তখন এই শাস্তি দেয়া হতো। এবং সেটাও দেয়া হতো বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের সময়, জাহাজের অন্যান্য সদস্যদের আনন্দ দেয়ার জন্য। তারা অপরাধীর হাত-পা বেঁধে দিতো যেন সাঁতার কাটতে না পেরে তারা মারা যায়।

৬। সব পাইরেট যে খুনি ছিল তা নয়। পাইরেটদের যখন সোনালী সময় চলছিল, শহরের ভালো মানুষের জন্য তখন ছিল ভয়ানক সময়। ভালো মানুষগুলোও তখন বাধ্য হয়ে পাইরেট হয়ে যায়। তারা শুধুমাত্র খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য পাইরেসি শুরু করে। উইলিয়াম কিড ছিল তেমন একজন পাইরেট, যে ‘ক্যাপ্টেন কিড’ নামে পরিচিত ছিল। ক্যাপ্টেন কিড জন্মগ্রহণ করে সম্ভ্রান্ত এক স্কটিশ পরিবারে। পাইরেট হিসেবে কুখ্যাত হলেও সে তার সাগর জীবন শুরু করে পাইরেট হান্টার হিসেবে।

৭। পাইরেটদের প্রতিটি আলাদা জাহাজে তাদের নিজেদের নিয়ম জারি ছিল। প্রতিটি জাহাজের জন্য একজন কোয়ার্টার মাস্টার এবং ক্যাপ্টেন থাকতেন। সেই ক্যাপ্টেনের নিজেদের তৈরী নিয়মে সেই জাহাজ চলাচল করতে হতো। তবে সবগুলো জাহাজকে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতেই হতো। খাদ্য কিংবা লুট করা ধনসম্পত্তির সঠিক ভাগ বাটোয়ারার ক্ষেত্রে প্রায় সবাই একই নিয়ম মেনে চলতো।

৮। সতেরশ-আঠারোশ শতকে নামকরা সব পুরুষ পাইরেটদের ভিড়ে নারী পাইরেটরাও রাজত্ব করেছে। সবচে পরিচিত পাইরেটদের মধ্যে অন্যতম ছিল- চেং আই সাও, মেরি রেড এবং কুখ্যাত এনি বনি। এনি বনি ছিল সম্ভ্রান্ত আইরিশ আইনজীবীর অবৈধ সন্তান। এনি বনি ছোটবেলায় ছেলেদের মতো পোশাক পরে থাকত তার বাবার ক্লার্ক হিসেবে কাজ করার জন্য। ক্যাপ্টেন ক্যালিকো জ্যাকের সাথে এনি বনির ছিল দারুণ এক প্রেমের সম্পর্ক। কথিত আছে, এনি বনি অত্যন্ত সাহসী ছিল এবং ক্ষিপ্ত মেজাজের অধিকারী ছিল। যদি কোন পুরুষ তার উপর জোর করতো সে তাদের কঠিন শাস্তি দিতো।

৯। আঠারো শতকে ‘নাসাউ’ ছিল জলদস্যুদের স্বর্গ। ‘নাসাউ’ বাহামার বড় একটি শহর। বাহামার প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ এ শহরে বাস করতো। তখন এ এলাকাটা ছিলো ব্যবসাবাণিজ্যের আতুরঘর। ১৭০০ সালের শুরুতে নাসাউ’তে কোন সরকার ছিলো না, কার্যতই কোন আইন-কানুনও ছিলো না। এসময় ‘নাসাউ’ শহর পাইরেটদের রাজ্যে পরিণত হয়। ধারণা করা হয়- এলাকাভিত্তিক পাইরেটস বাদে এখানে প্রায় ১০০০ পাইরেট ছিলো। পাইরেটরা এ শহরের নাম দেন পাইরেটস রিপাবলিক। একই সাথে ঘোষণা দেয় তারাই এ অঞ্চলের শাসক। পরবর্তীকালে আঠারো শতকের শেষের দিকে বৃটিশরা নাসাউ-এর নিয়ন্ত্রন নেয়।

১০। পাইরেটরা যে প্রতীক ব্যবহার করতো তার নাম জলি রজার। এটি একটি সাদা মাথার খুলি এবং ক্রসবোন সংবলিত প্রতীক যার পেছন দিকে কালো রঙ ব্যবহার করা হত। মূলত এটিই তাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বিভিন্ন পাইরেট (ক্যাপ্টেন) নিজেদের আলাদা পরিচিতির জন্য এটা পরিবর্তন করতো।


তথ্যসূত্রঃ -১। এগিয়ে চলো ডট কম; ২। দ্য রিচেস্ট।

Article Categories:
সেরা দশ