রজার ফেদেরার: মন খারাপ করার কী আছে!

by
Jan 5, 2016
202 Views
Comments Off on রজার ফেদেরার: মন খারাপ করার কী আছে!

বিশ্বের আলোচিত টেনিস খেলোয়াড় সুইজারল্যান্ডের রজার ফেদেরার। জন্ম ১৯৮১ সালের ৮ আগস্ট সুইজারল্যান্ডের বাসেলে। বিশ্বসেরার এটিপি র্যাংকে এখন তাঁর অবস্থান শীর্ষ ২। রজার ১৭টি একক গ্র্যান্ড স্লামসহ ৯০ বার একক ও দ্বৈত শিরোপা জয় করেন। তিনি প্রথম টেনিস তারকা, যিনি খেলা থেকে পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার পুরস্কার হিসেবে আয় করেন। ২০০৩ সাল থেকে তিনি রজার ফেদেরার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ শুরু করেন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আগের সময়টা বদলে গেছে। আমার বয়স বেড়েছে। কিন্তু টেনিস খেলার প্রতি কিশোর বয়সের সেই উত্তেজনা আর আগ্রহ এখনো আমার শরীরে আছে। তবে সেই বয়সে আমি প্রতি ম্যাচ খেলার পরে কান্না করতাম। আমি আমার শেষ সীমা জানতাম না তখন। আমি খুব আবেগী ছিলাম তখন। সময় বদলেছে, এখন আমি জানি আমি কী করতে পারি। কীভাবে মাঠে লড়াই করতে হয় তা আমি জানি। কৈশোরে আমি ফুটবল আর টেনিস দুটোই খেলতাম। তবে স্থানীয় পর্যায়ের বেশ কটি টেনিস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল। যার কারণেই আমার টেনিসেই ঘর বাঁধা। এলাকায় খেলতে খেলতে একসময় নিজেকে আমি জাতীয় পর্যায়ের খেলার কোর্টে আবিষ্কার করি। সেই সময়গুলো ছিল দুর্দান্ত!

মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটো নিয়ম প্রতিনিয়ত খেয়াল রাখা উচিত। প্রথমত, সব পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখা। দ্বিতীয়, নিজের পথ নিজেই ঠিক করে সামনে এগিয়ে চলা এবং তার জন্য যথাসাধ্য কাজ করা। রেকর্ড আমার জন্য কোনো বিশেষ ব্যাপার নয়। আমি নিশ্চিত আমার রেকর্ডগুলো কোনো না কোনো এক দিন ভাঙবেই। সব সময় রেকর্ড সেরাদের হাতেই থাকে। আমি যখন প্রথম উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন হই, তখনকার অনুভূতি এখনো আমার মনে পড়ে। আমি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরে কোর্টে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি। সেই মুহূর্তে আমার নাম একজন সুইস হিসেবে টেনিস ইতিহাসে লেখা হয়।

টাকাকড়িই আমার জন্য সব নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের ভেতরকার খুশি। আমি আমার জীবন নিয়ে খুশি। পৃথিবীর মানুষ আমাকে সব সময়ই অবাক করে দেয়। একবার না দুইবার না, বারবার। যেসব জায়গায় টেনিস হয়তো খেলা হয় না, সেসব জায়গার মানুষেরাও আমাকে চেনে। আমি একবার ইথিওপিয়াতে গিয়েছিলাম, আমার ফাউন্ডেশনের জন্য কাজ করতে। আমাকে সাধারণ মানুষ সব সময়ই ঘিরে থাকত। দক্ষিণ আমেরিকায় যাওয়ার পরে আমার হোটেলের সামনে দেড় শ জন ভক্ত অপেক্ষা করছিল। এটা আমার জন্য পরম পাওয়া। আমি সব সময় জানি আমি কী চাই। সেই চাওয়ার জন্য আমি একঘুয়ে আচরণ করি। আমি নিখুঁত খেলার চেষ্টা করি। আমেরিকানরা বলে, স্বপ্নকে তাড়া করো। আমি এই প্রবাদ বাক্যকেই অনুসরণ করে চলেছি। সবাইকে স্বপ্ন দেখতে হবে। লক্ষ্য ছোঁয়ার নেশা জন্মাতে হবে। আমার সব সময়ের স্বপ্ন ছিল টেনিস নিয়ে।

ছোটবেলায় আমি ছাত্র হিসেবে মোটামুটি মানের ছিলাম। আমার ফল ভালো ছিল, কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল মনোযোগহীনতা। যৌক্তিক চিন্তাভাবনা করতে পারতাম না একটুও। কিন্তু তারপরেও আমি সবকিছুতেই প্রেরণা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতাম। কোনো কিছু করার আগ্রহ জাগলে আমি সেটা করেই ছাড়তাম। খেলার সময় সব সময় চাপ থাকে। সবদিক থেকে চাপ আছে; পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে। আমি সব সময়ের জন্য পৃথিবীর সেরা টেনিস খেলোয়াড় হয়ে থাকতে পারব না। পৃথিবীর জন্য কিছু করতে চাই আমি। আমি আফ্রিকার শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। মালাউইতে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি। ১০ বছর ধরে আমরা ৫০ হাজার শিশুকে শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাই। আফ্রিকা ছাড়াও অনেক দেশে আমার ফাউন্ডেশন কাজ শুরু করেছে। আমরা ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীর শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ শুরু করতে চাই।

আমাকে অনেক তরুণ অনুসরণ করে। অনেক অভিভাবক তাঁর সন্তানকে বলেন, রজারের মতো এটা করো, ওটা কোরো না! এটা নিশ্চয়ই আমার জন্য অনন্য এক পাওয়া। সব ধরনের পেশায় উত্থান-পতন থাকবেই। অনুপ্রেরণা সব সময়ই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কে পরাজিতকে মনে রাখে? আপনাকে নিজেকেই উৎসাহ দিতে হবে। লড়াই করে জিততে হবে। ফাইনালে খেলা আর জেতা দুটো দুই বিষয়ই। বিজয়ীকে ইতিহাস মনে রাখে। আমি সব ম্যাচে জিতি না, হেরে যাই। কিন্তু মন খারাপ করে বসে থাকি না। কোনো ম্যাচ জেতার পরে আমার যে আত্মবিশ্বাস থাকে, হেরে গেলেও আমি একই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার চেষ্টা করি। মানুষকে তার আত্মবিশ্বাসই সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমি যদি গ্র্যান্ড স্লাম জিতি তাহলে পৃথিবীসেরা হওয়ার দিকে এগিয়ে যাব। আমার সামনে সে সুযোগ সব সময়ই থাকে। আমি সব সময় চেষ্টা করে যাই। টেনিস কোর্টেই আমার ভাগ্য আমার শ্রম, বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্ধারিত হবে। সব সময়ের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। নিজের পথ নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে।

তথ্যসূত্র:

প্রথম আলো (২৫ আগস্ট ২০১৪ স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেডে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার অবলম্বনে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর)

Facebook Comments
Article Categories:
সাক্ষাৎকার